Skip to main content
ফাগুনের এই প্রথম প্রহরী
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যতই বলুন, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত, তাতে কিন্তু আমাদের বসন্তের আদৌ কিছু এসে যায় না। কারণ সে এবার সত্যি সত্যি ফেঁসে গেছে। বাবা-মা জোর করে তাদের পছন্দের পাত্রীটির সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেছে। বসন্ত আমার বন্ধু, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে মাস্টার্স সুসম্পন্ন করেছেই শুধু নয়, প্রথম শ্রেণিতে সদর্পে উত্তীর্ণও হয়েছে। কিন্তু তাতে কী! সম্পর্কের রসায়নে বরাবরই সে বড্ড কাঁচা। তাই ঋতুরাজ বসন্ত দুয়ারে তো কী হয়েছে! আমার বন্ধু শ্রীমান বসন্ত সোমের জন্য ঋতুরাজ কিন্তু কোনো রঙই ছড়াতে পারেনি। বরং ফাগুনের এই প্রথম প্রহরে আগুনরঙা শাড়ি পরিহিতা সুন্দরী সুবেশা তরুণীকুল দেখে ব্যাকুল চেয়ে থাকে আমাদের বসন্ত সোম।
সে যাক গে, বসন্ত এলে আসলে কী হয়! মনে রঙ লাগে, নাকি প্রকৃতিতে! রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ অবশ্য মনে করতেন, প্রকৃতি ও মন একে অপরের পরিপূরক। যার মন ভালো নেই সে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেলে তাতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে। আবার যার মনে রঙ লেগেছে সে যা দেখে তাই ভালো লাগে। বিরান মরুভূমি কিংবা পত্রপুষ্পহীন গাছের মাঝেও সে প্রাণের খোঁজ পায়। অর্থাত্ মনোজগতের সৌন্দর্যের ছোঁয়ায় মাধুর্যময় হয়ে ওঠে এধার ওধার চারিধার— নিসর্গ ও পারিপার্শ্ব। প্রায় একই রকমভাবে রবি ঠাকুর বলেছেন: অন্তর বাজে তো যন্ত্র বাজে। যার অন্তরে ছন্দ নেই, প্রাণ নেই, তিনি যত ভালো বাজনাই শিখুন না কেন, তার হাতে যন্ত্র কিন্তু ঠিকঠাক বাজবে না, বড় জোর ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠতে পারে। মানে আমি বলতে চাইছি, বসন্ত এসেছে আসুক, তাতে কোনো ক্ষতি নেই। চারদিকে শিমুল-পলাশ দেদার হাসছে হাসুক, তাতেই বা কী এসে যায়! যদি না তোমার হূদয়মন্দিরে কেউ আলতো কড়া নেড়ে মিহিস্বরে বলে, এই যে আমি। তোমার খুব কাছে, হাত বাড়ালেই যাকে ছোঁয়া যায়।
গুরুগম্ভীর গৌরচন্দ্রিকা হলো, চলুন এবার আসল কথায় আসা যাক। নগরে নিসর্গ বলে একটা কথা পত্র-পত্রিকার বদৌলতে আমরা প্রায়শ শুনে থাকি। বিশেষ করে বর্ষার আগমনী গানে আর মাঘী শীতের শেষে ফাগুনের গোড়াপত্তনে বেচারা নিসর্গকে নিয়ে বড্ড বেশি টানাহ্যাঁচড়া চলে। বসন্তের সাথে তারুণ্যের একরকম যোগসূত্র আছে, তাই অন্য ঋতুর তুলনায় বসন্তকে নিয়ে আমাদের মাতামাতি বেশি। জীবনেও যে কিনা হলুদ পাঞ্জাবি পরেনি, বসন্তদিনের শুরুতে তারও শখ হয় একটু রঙচঙে বেশবাস ধারণের।
বসন্তের সাথে নবজাগরণের কিন্তু এক বিশেষ সম্বন্ধ রয়েছে। ফাগুন মানে বর্ণালী, ফাগুনের রঙে মিশে থাকে জীবন ও তারুণ্যের ছবি। এইজন্যই বুঝি ইংরেজ কবি পার্সি বিসি শেলি লিখেছেন: ইফ উইন্টার কামস, ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড! অর্থাত্ ঋতুরাজ বসন্ত এখানে আস্থা ও আশাবাদের প্রতীক। কবি শেলি বসন্ত ঋতুর মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ততাকেই পারসোনিফাই করেছেন। আমরা সকলে ফাগুনের রঙে সুশোভিত হতে চাই, কিন্তু শীতের তীব্রতা কেউ চাই না। অথচ একটু ভেবে দেখুন, শীতের পরে বসন্ত আসে বলেই কিন্তু ফাগুন আমাদের কাছে এত বেশি প্রার্থিত। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে মাঠঘাট ফেটে যখন চৌচির হয়, জনজীবন হয়ে ওঠে ওষ্ঠাগত, তখনই কেবল শ্রাবণধারা আমাদের মনে ও মননে বারিসিঞ্চন করে। আমরাও শুচিস্নানে পবিত্র হয়ে উঠি
Comments
Post a Comment